বাংলাদেশের বনভূমিতে আধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
ভূমিকা: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বনভূমিবেষ্টিত পার্বত্য অঞ্চল। বাংলাদেশের মোট আয়তনের এই বনভূমির পরিমাণ খুবই সামান্য। অধিবাসী জনগণ আবার বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে দেশের মূলধারা হতে বিচ্ছিন্ন প্রায়। নিম্নে প্রশ্নালোকে বাংলাদেশের বনভূমিতে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা হলো।
বনভূমিতে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের পদক্ষেপ:
বাংলাদেশ বিশ্বপরিমণ্ডলে আয়তনে ক্ষুদ্র একটি দেশ। এই দেশের আয়তনের তুলনায় বনভূমির পরিমাণ মাত্র ছয় শতাংশ, যা এই বনভূমির উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই সরকার কীভাবে বনভূমিকে আরো বেশি উৎপাদনশীল করা যায় সে ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো-
১. বনভূমি রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড:
বনের সংরক্ষণ ও বনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আদিবাসী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতভাবে তাকে বলা হয় বনের অধিকার।
(ক) আদিবাসী সম্প্রদায় যে বনভূমিতে বসবাস করে সেই বনভূমির উপর তাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা এর আওতায় থাকে। যথা-
- বনে গবাদিপশু চারণ: প্রত্যেকটি আদিবাসী যাতে করে বনে গবাদিপশু চারণ করতে পারে সেই অধিকার দিতে হবে।
- ফল-ফসল, সবজি চাষের অধিকার: পার্বত্য আদিবাসী যাতে করে তারা নিজেরা ফল-ফসল ও সবজি চাষ করতে পারে সেই অধিকার দিতে হবে।
- জ্বালানি সংগ্রহ: আদিবাসী লোকেরা প্রত্যেক বন থেকে কাঠ সংরক্ষণ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। কেননা আদিবাসী লোকেরা সবসময় কাঠ কেটে তাদের জীবন পরিচালনা করে থাকে।
- কৃষিকাজ অধিকার: আদিবাসী লোকেরা যাতে করে বনে কৃষিকাজ করতে পারে সেই অধিকার দিতে হবে। কেননা বনে কৃষি কাজ করে তাদের জীবন অতিবাহিত করতে হয়।
(খ) শিকার সংগ্রাহক সমাজ যে পর্যন্ত চারণ করবে সে পর্যন্ত বনভূমি তাদের বনভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
(গ) রাষ্ট্র কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলে ঐ বনভূমিতে বসবাসরত আদিবাসীদের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে অন্যত্র সমপরিমাণ বনভূমিতে তাদের পুনর্বাসিত করতে হবে।
(ঘ) আধিবাসীদের যেকোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যগত যা সাংস্কৃতিক প্রয়োজন তাদের বনভূমি যথেষ্ট ব্যবহারের স্বাধীনতা দিতে হবে।
২. সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ:
বাংলাদেশে বসবাসরত অধিকাংশ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। ফলে তারা জীবন ও জীবিকার জন্য নানাভাবে বনভূমির উপর নির্ভরশীল। ১৮৭১ সাল থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত পার্বত্য এলাকায় তিন-চতুর্থাংশ ভূমি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সরকারি বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করেছিল। অবশিষ্ট বনভূমির মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট বনভূমি ছাড়া অন্য সমগ্র বনভূমি সরকারি খাসজমি হিসেবে নির্দিষ্ট হয়। সরকারি জমির এক-চতুর্থাংশ আবার নির্দিষ্ট সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে তাতে পাহাড়ি বনজীবী মানুষের সার্বিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। আর বাকি বনাঞ্চল পাহাড়িদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। শুষ্ক মৌসুমে যখন ফসল উৎপাদন হ্রাস পায় তখন বিভিন্ন বনজীবী দরিদ্র মানুষ এখানে উৎপাদিত খাদ্য পণ্যসমূহ বিক্রয় করেও জীবিকানির্বাহ করতে পারে। আর প্রতিটি সাধারণ বনে কি চাষ করা হবে মৌজা প্রধানদের সাথে নিজস্ব মৌজাভিত্তিক জনগণের মতামত বিনিময়ের প্রেক্ষিতে নির্ধারিত হয় এক-একটি VEF-এ একেক ধরনের নিয়ামক থাকলে তা মোটামুটি নিম্নরূপ-
(ক) VEF এলাকায় কোনো আগুনের কাজ করা যাবে না।
(খ) কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত VEF এলাকায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ।
(গ) অনুমতি ছাড়া বাঁশ কর্তন করলে জরিমানা দিতে হবে।
(ঘ) ফল, সবজি, বাঁশ পরিণত না হলে কাটা নিষেধ।
(ঙ) মুনাফার ভিত্তিতে VEF পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ।
(চ) বনের বিভিন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
(ছ) VEF এলাকায় সব ধরনের শিকার নিষিদ্ধ।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে বনভূমির উপর নির্ভরশীল। তাই বন রক্ষার জন্য সরকার কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যার ফলে বনগুলো এখনো তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে।

No comments:
Post a Comment